হাওজা নিউজ এজেন্সি: পরিবারবিষয়ক পরামর্শক হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন রেজা ইউসুফজাদেহ স্বামী বা স্ত্রীর পক্ষ থেকে ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিসরে অসম্মানজনক আচরণের বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন, পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মান। তিনি এমন সম্পর্ক সংশোধনের জন্য চারটি বাস্তবসম্মত করণীয় তুলে ধরেন।
প্রশ্ন করা হয়েছিল: আমি যদি আমার জীবনসঙ্গীকে সম্মান করি, কিন্তু তিনি আমাকে যথাযথ সম্মান না দেন, তাহলে আমার করণীয় কী? আমার স্বামী/স্ত্রী ব্যক্তিগত ও সবার সামনে আমাকে অসম্মান করেন। অনেক সময় মনে হয়, যেন আমি তার দাসী বা চাকরানী। এ অবস্থায় কী করা উচিত?
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন রেজা ইউসুফজাদেহের উত্তর:
সমস্যার বিশ্লেষণ
সম্মান মানুষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন। আর পরিবার এমন একটি স্থান, যেখানে প্রত্যেক সদস্যের উচিত একে অপরের মর্যাদা ও মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেওয়া।
যে ব্যক্তি দীর্ঘদিন অসম্মান ও অবমূল্যায়নের শিকার হন, তার মনে এমন অনুভূতি তৈরি হতে পারে—“আমাকে যেন একজন সেবক বা অধীনস্থ ব্যক্তির মতো দেখা হচ্ছে।” তবে সুস্থ পারিবারিক সম্পর্ক কখনো অপমান বা একতরফা কর্তৃত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।
যখন একজন জীবনসঙ্গী অপরজনকে সম্মান করেন না এবং অপর পক্ষও প্রতিক্রিয়ায় একই আচরণ শুরু করেন, তখন সম্পর্কের মধ্যে নেতিবাচক একটি চক্র তৈরি হয়। এতে শেষ পর্যন্ত উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হন। কারণ সম্পর্কের অবনতি কোনো পক্ষের জন্যই কল্যাণকর নয়।
যে ব্যক্তি তার জীবনসঙ্গীকে অপমান করেন, তিনিও মূলত নিজের সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করেন। তাই সমস্যা সমাধানের জন্য প্রতিশোধমূলক আচরণের পরিবর্তে গঠনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

করণীয়:
১. নিজের সঠিক আচরণ বজায় রাখুন
অন্যের ভুল আমাদের ভুল আচরণের অনুমোদন দেয় না। কেউ সম্মান না করলেও নিজের পক্ষ থেকে সম্মানজনক আচরণ বজায় রাখা উচিত।
প্রবাদ রয়েছে—“যেমন পাত্র, তেমনই তার ভেতরের বিষয় প্রকাশ পায়।” অর্থাৎ আমার আচরণ আমার ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে।
অন্য পক্ষের আচরণ পরিবর্তন করা কঠিন হতে পারে, তবে নিজের নৈতিক অবস্থান ধরে রাখা সম্ভব। ভালো আচরণ অনেক সময় সম্পর্কের নেতিবাচক ধারা পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে।
২. অভিযোগ নয়, অনুভূতি প্রকাশ করুন
সম্পর্কের পরিবেশ যখন শান্ত থাকে, তখন নিজের অনুভূতি জীবনসঙ্গীর কাছে প্রকাশ করুন।
যেমন বলা যেতে পারে: “আমি মাঝে মাঝে অনুভব করি, আমার সঙ্গে এমনভাবে আচরণ করা হয়, যা আমাকে কষ্ট দেয়।”
তবে কথা বলার সময় সরাসরি অভিযোগ বা দোষারোপের ভাষা পরিহার করা জরুরি।
যেমন—
• “তুমি সবসময় আমাকে অপমান করো।”
• “তুমি আমাকে কোনো মূল্য দাও না।”
এ ধরনের বাক্য অপর পক্ষকে আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।
এর পরিবর্তে বলা ভালো— “তোমার এই আচরণে আমি কষ্ট পাই” অথবা “আমি এমন অনুভব করি...”
এ ধরনের ভাষা পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহানুভূতি বাড়ায়।
তবে মনে রাখতে হবে, একবার কথা বললেই আচরণ পরিবর্তন হবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। পরিবর্তনের জন্য সময় ও ধৈর্য প্রয়োজন।
৩. শুধু নিষেধ নয়, করণীয় বিষয় স্পষ্ট করুন
শুধু “এটা করো না” বলার পরিবর্তে কীভাবে আচরণ করলে সম্পর্ক সুন্দর হবে, তা স্পষ্টভাবে জানান।
যেমন:
• “আমি চাই, সবার সামনে আমাকে সম্মানজনকভাবে সম্বোধন করা হোক।”
• “আমার কাছে কোনো কিছু চাইলে অনুগ্রহ করে ভদ্র ভাষা ব্যবহার করুন।”
• “সবার সামনে আমার সঙ্গে সম্মানের সঙ্গে কথা বলুন।”
অর্থাৎ শুধু ভুল আচরণ বন্ধ করার কথা না বলে, সঠিক আচরণের দৃষ্টান্তও তুলে ধরতে হবে।
৪. জীবনসঙ্গীর অপূর্ণ প্রয়োজনগুলো বোঝার চেষ্টা করুন
অনেক সময় মানুষের কঠোর আচরণ বা অতিরিক্ত অভিযোগের পেছনে কোনো অপূর্ণ চাহিদা বা মানসিক কষ্ট লুকিয়ে থাকে।
অভিযোগ ও বিরক্তির মাধ্যমে মানুষ অনেক সময় নিজের প্রয়োজন প্রকাশ করে, যদিও তা সঠিক পদ্ধতিতে প্রকাশ পায় না।
তাই খুঁজে দেখুন—
• আপনার জীবনসঙ্গীর কোনো অপূর্ণ প্রয়োজন আছে কি না;
• কোন বিষয় তাকে কষ্ট দিচ্ছে;
• কোন জায়গায় তার অসন্তুষ্টি রয়েছে।
সেই বিষয়গুলো বোঝার চেষ্টা করলে সম্পর্কের উত্তেজনা কমতে পারে।
মানুষের কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন দীর্ঘদিন পূরণ না হলে তার আচরণে বিরক্তি, রাগ বা কঠোরতা দেখা দিতে পারে। তাই শুধু বাহ্যিক আচরণ নয়, আচরণের পেছনের কারণও বোঝার চেষ্টা করা উচিত।
সম্পর্ক সংশোধনের মূল চাবিকাঠি হলো—পারস্পরিক সম্মান, ধৈর্য, সঠিক যোগাযোগ এবং একে অপরের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া।
আপনার কমেন্ট